একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের অভিজ্ঞতা কখনোই শুধু ব্যক্তিগত একটি ঘটনা নয়। বিশেষ করে যখন সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে লিঙ্গ পরিচয়, মানবিক মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং সমান আচরণের প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে, তখন তা বৃহত্তর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের জুনে ব্যঞ্জনা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এবং একজন ট্রান্সজেন্ডার নারী ট্রিয়ানা নয়নতারা হাফিজ কক্সবাজারের উখিয়ার মরিচ্যা চেকপোস্টে নিরাপত্তা তল্লাশির সময় এমন একটি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, যা পরবর্তীতে তিনি প্রকাশ্যে তুলে ধরেন। তাঁর বর্ণনায় উঠে আসে পরিচয়ভিত্তিক প্রশ্ন, অসম্মানজনক ভাষা, শরীরকেন্দ্রিক কৌতূহল এবং তল্লাশির সময় তৈরি হওয়া ভয় ও অস্বস্তির অভিজ্ঞতা।
এই অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখে যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ার মধ্যেও কি প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সমান আচরণ নিশ্চিত করা সম্ভব? ব্যঞ্জনা ফাউন্ডেশনের বিশ্বাস যে অবশ্যই সম্ভব, এবং সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় সেবার মানদণ্ড।
মানবাধিকারের মূল ভিত্তিগুলোর একটি হলো সমতা ও মর্যাদা। কোনো নাগরিকের লিঙ্গ পরিচয় তার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কিংবা সম্মানজনক আচরণ পাওয়ার অধিকারকে কমিয়ে দিতে পারে না। নিরাপত্তা তল্লাশি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার একটি প্রয়োজনীয় অংশ হতে পারে। কিন্তু সেই তল্লাশি যেন কোনো ব্যক্তির পরিচয়কে কৌতূহল, সন্দেহ, উপহাস বা অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদের কারণ না বানায় এটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রান্সজেন্ডার ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় মানুষের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের পরিচয় এখনও অনেক সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে প্রচলিত ধারণা, নেতিবাচক মনোভাব ও সামাজিক কলঙ্কের সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি সাধারণ নিরাপত্তা যাচাইও তাদের জন্য অতিরিক্ত নজরদারি, মানসিক চাপ বা নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।
এই অভিজ্ঞতাকে একই সঙ্গে বিভিন্ন পরিচয় ও সামাজিক অবস্থানের আন্তঃসম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা প্রয়োজন। একজন মানুষ একই সঙ্গে একজন নাগরিক, একজন নারী, একজন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি, একজন পেশাজীবী এবং একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের অংশ। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে তার যোগাযোগের সময় এই পরিচয়গুলো আলাদাভাবে নয়, বরং পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তার অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে। উচ্চশিক্ষা, পেশাগত অবস্থান বা সামাজিক পরিচিতি কোনো ব্যক্তিকে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেয় না। বিশেষ করে যখন একজন প্রান্তিক লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষ একটি ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সামনে অবস্থান করেন, তখন ক্ষমতার ভারসাম্য স্বাভাবিকভাবেই অসম হতে পারে। তাই অন্তর্ভুক্তির অর্থ শুধু সবার সঙ্গে একই আচরণ করা নয়; বরং ভিন্ন মানুষ বাস্তবে কোথায় এবং কী ধরনের ঝুঁকি ও অসহায়তার মুখোমুখি হন, সেটিও বোঝা।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিজিবি ৩০ ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তদন্তের পর সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ব্যঞ্জনা ফাউন্ডেশন এই প্রতিক্রিয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখে। কারণ জবাবদিহিতা শুধু একটি ঘটনার সমাধান করে না, এটি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের মধ্যে আস্থা তৈরির সুযোগও সৃষ্টি করে। তবে আমাদের বিশ্বাস, জবাবদিহিতার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, সেটিই দীর্ঘমেয়াদে আরও গুরুত্বপূর্ণ। এই অভিজ্ঞতা থেকে সীমান্ত ও চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের জন্য মানবাধিকার, লিঙ্গ-সংবেদনশীলতা, মানবিক মর্যাদা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক যোগাযোগ বিষয়ে নিয়মিত ও বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের নাগরিকদের নিরাপত্তা তল্লাশির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মর্যাদা, উপযুক্ত ভাষার ব্যবহার এবং শারীরিক তল্লাশির সীমা সম্পর্কে স্পষ্ট ও লিখিত নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একটি সুস্পষ্ট আচরণবিধি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির লিঙ্গ পরিচয়, পোশাক, শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা লিঙ্গ প্রকাশ যেন অবমাননাকর ভাষা, উপহাস কিংবা অপ্রয়োজনীয় কৌতূহলের কারণ না হয় এ বিষয়ে পরিষ্কার প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান থাকা দরকার।
একই সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ, গোপনীয় এবং সহজলভ্য অভিযোগ ও মতামত জানানোর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যাতে কোনো ব্যক্তি অভিযোগ করার কারণে পুনরায় হয়রানি বা প্রতিশোধমূলক আচরণের আশঙ্কায় নীরব না হয়ে যান।
নীতিমালা ও প্রশিক্ষণ তৈরির ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ট্রান্সজেন্ডার ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় মানুষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ ও পরামর্শের ব্যবস্থা থাকলে নীতি ও প্রশিক্ষণ আরও বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর হতে পারে। শুধু প্রশিক্ষণ আয়োজন করাই যথেষ্ট নয়, প্রশিক্ষণের ফলে মাঠপর্যায়ে আচরণগত পরিবর্তন হচ্ছে কি না, একই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্ত হচ্ছে কি না এবং নাগরিকদের অভিজ্ঞতা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে সেসব বিষয়ও নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ব্যঞ্জনা ফাউন্ডেশন মনে করে, এই ধরনের ঘটনা নিয়ে আলোচনার লক্ষ্য শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হওয়া উচিত নয়। বরং প্রতিটি ঘটনার মধ্য থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তৈরি করা প্রয়োজন। একটি অভিযোগ থেকে তদন্ত হতে পারে। তদন্ত থেকে জবাবদিহিতা আসতে পারে। কিন্তু সেই জবাবদিহিতা যদি প্রশিক্ষণ, নীতির উন্নয়ন, পর্যবেক্ষণ এবং কমিউনিটির সঙ্গে অর্থবহ সংলাপের দিকে নিয়ে যায়, তখন একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বৃহত্তর পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদা একে অপরের বিপরীত নয়। একটি কার্যকর ও মানবাধিকারভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা একই সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে।
ব্যঞ্জনা ফাউন্ডেশন বিশ্বাস করে, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রীয় সেবা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়। এটি সমতা ও মানবাধিকারের অংশ। একজন ট্রান্সজেন্ডার বা লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় নাগরিক যেন নিজের পরিচয়ের কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সামনে অতিরিক্ত ভয়, সন্দেহ, অপমান বা অস্বস্তির মুখোমুখি না হন এটি শুধু একটি কমিউনিটির দাবি নয়, এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্রের মৌলিক প্রত্যাশা। এই কারণে আমাদের এখন প্রতিক্রিয়া থেকে প্রতিরোধের দিকে, বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দিকে এবং নীতির কাগজ থেকে বাস্তব আচরণগত পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
